ক্রিকেট ও বাংলাদেশ

1692

বিশ্ব ক্রিকেট দরবারে বাংলাদেশের ইতিহাস বেশি দিনের নয়। আমরা এখনও এখানে তারুণ্য পার করছি। সাদামাটাভাবে যদি বলি, ১৯৯৭ সালে আইসিসি চ্যাম্পিয়ন হওয়ার আগে আমাদের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা ছিলো ফুটবল।দেশের মাঠঘাট, রাস্তা সব এখন দখল করে নিয়েছে ক্রিকেট। আর তার সাথে স্বাভাবিকভাবে তৈরি হয়েছে ক্রিকেট উন্মাদনা। তবে ক্রিকেটের প্রতি এই পাগল করা ভালোবাসা, খেলোয়াড়দের প্রতি প্রচণ্ড শ্রদ্ধা – এই সব কিন্তু এখন শুধু খেলার মাঠে সীমাবদ্ধ নেই। বাংলাদেশ, এমনকি পুরো উপমহাদেশের মানুষ নিজের জাতীয়তাবোধের সাথে একে মিশিয়ে নিয়েছে। তাই, যখন দুই দলের খেলা হয়, তখন দুইটি দেশও যেন একে অন্যের মুখোমুখি দাঁড়ায়। দুই দেশের সমর্থকরা দাঁড়ায় একে অপরের বিরুদ্ধে। মাঠে সহিংস আচরন সীমিত থাকলেও, অনলাইন বা ভার্চুয়াল ময়দানে কিন্তু দাবানল ছড়িয়ে দেয়। খেলার সময়কার বিভিন্ন কমেন্ট, ছবি, পোস্ট এমনকি টিভির দিকে তাকালেও সেটা খুব ভালোভাবে অনুভব করা যায়।

এই আচরন কি তাহলে অস্বাভাবিক? আমরা কি তাহলে নিজেদের পরিমিতি বোধ জানি না? আসলে কিন্তু তা নয়। খেলার সাথে রাজনীতির সম্পর্ক বহু পুরনো। আন্তর্জাতিক খেলাধুলার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে রাজনীতি মিশে আছে। শুধুমাত্র ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে মাঠে রক্ত ঝরিয়েছে বহু দেশের মানুষ। এখন দেশে দেশে লড়াই প্রাচীনকালের তুলনায় অনেক কম হয়। শিক্ষা, শিল্প, সাহিত্য, চলচ্চিত্র, খেলা – এসব দিয়ে একেকটা জাতি নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা করে, তাই স্বাভাবিক নিয়মে সমর্থকদের মধ্যে সেই রেশ ছড়িয়ে পড়ে। ‘স্পোর্টস ডিপ্লোমেসি’ বলে কিন্তু একটা শব্দও আছে। এর মাধ্যমে খেলার রাজনৈতিক ব্যবহার অহরহ ঘটছে।

তাই যখন দুই দেশের মধ্যে খেলা হয়, তখন দর্শকদের জন্য সেটা শুধু সাধারন সময় কাটানো না। জাতীয় সংগীত দিয়ে শুরু হওয়া একেকটা ইভেন্ট এর অন্য প্রতীকী অর্থও আছে। খেলার হারজিত দিয়ে দেশের মানুষ জাতীয় মর্যাদা পরিমাপ করে। খেলা দিয়ে, খেলোয়াড়দের মাধ্যমে জাতীয়তাবাদ চর্চা করে। বিশেষ করে খেলাটা যখন উপমহাদেশের দেশগুলোর মধ্যে হয়, তখন এর সাথে খুব ভালোভাবে রাজনীতিও জড়িয়ে যায়। রাজনৈতিক মনস্তত্ত্ব তখন আর মাঠের বাইরে থাকে না। তাই খেলোয়াড়দের উপরে থাকে পর্বত পরিমান আশা আকাংখা মেটানোর চাপ। জিতে আসলে বীর, জাতীয় নায়ক; কিন্তু হেরে গেলে? হেরে গেলে পরিবার পরিজনও রেহাই পায় না অপমানের হাত থেকে। এই পরিস্থিতি থেকে দেশের মানুষ বের হতে পারবে তখনি, যখন অন্য খেলাগুলো একী রকম জনপ্রিয়তা পাবে। সাফল্য নিয়ে আসবে। লাঠির আঘাতে এই উন্মাদনা কখনও কমবে না।